সুইতা পাল, নিজস্ব সংবাদদাতা, আরএনবি : দূর্গাপূজার সঙ্গে ঢাকের তালে তাল মেলানো বাঙালির আবেগের অঙ্গ। পূজোর মণ্ডপে দেবীর আরাধনা যেমন আবশ্যিক, তেমনই ঢাকের গর্জন ছাড়া যেন সেই আরাধনা পূর্ণতা পায় না। ঢাকের প্রতিটি ধ্বনি শুধু বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ নয়—তা বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ, সংস্কৃতি আর শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অদৃশ্য বন্ধন।
কিন্তু এই উৎসবের উজ্জ্বল আলোয় ঝলমলে মণ্ডপের আড়ালে থেকে যায় ঢাকিদের কঠিন বাস্তব। দুর্গাপূজা তাঁদের কাছে শুধুমাত্র কয়েকদিনের কাজ নয়, বরং এক গভীর আবেগ, এক নিঃস্বার্থ উৎসর্গ। বছরের পর বছর ধরে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে ধরে রেখেছেন তারা, কিন্তু সে তুলনায় তাদের জীবনের সংগ্রাম যেন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রতি বছর পূজোর সময় ঢাকিদের চাহিদা থাকলেও বছরের বাকি সময় প্রায় কোনও কাজই থাকে না। পূজোর কয়েকটি দিনই তাঁদের আয়ের প্রধান ভরসা। বেশিরভাগ ঢাকি কলকাতা বা জেলায় পূজোর মরসুমে গড়ে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকার মতো পান, যা দিয়ে সারাবছর সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন। অথচ এই টাকায় শুধু সংসার নয়, ঢাকের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও চালাতে হয়।
প্রতিটি ঢাকই ঢাকির পরম সঙ্গী। তবে এই ঢাককে সারিয়ে তোলার পেছনে থাকে অনেক পরিশ্রম ও খরচ। প্রতি বছর পূজোর আগে ঢাকের চামড়া বদলানো, বাঁধন শক্ত করা, কাঠি-বাঁশি ঠিক করানো, এমনকি নির্দিষ্ট পোশাক যেমন ধুতি, গামছা, পাগড়ী কেনা পর্যন্ত মিলিয়ে ঢাকিদের খরচ পড়ে যায় ২-৩ হাজার টাকার মতো। এবছর আবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সেই খরচও বেড়েছে বহুগুণে। কিন্তু এই অতিরিক্ত খরচের তুলনায় আয় বাড়ছে না বরং অনেক পুজো কমিটি এবার বাজেট কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ ঢাকিদের।
একসময় গ্রামবাংলা থেকে বহু ঢাকি কলকাতায় এসে বড় বড় বারোয়ারি পূজোয় বাজানোর সুযোগ পেতেন। তখন ঢাকিরা ছিলেন পূজোর অঙ্গনায় এক অনিবার্য অংশ। এখন সেই জায়গা কিছুটা দখল করে নিয়েছে ব্যান্ড পার্টি, ডিজে মিউজিক বা ইলেকট্রনিক সাউন্ড সিস্টেম। প্রযুক্তির দাপটে ঢাকের মাধুর্য অনেক সময়ই ম্লান হয়ে যায়, আর সেইসঙ্গে কমেছে ঢাকিদের কদর। ফলে এই প্রজন্মের অনেকেই আর এই পেশায় আসতে চাইছে না। তারা চায় একটু স্থায়িত্ব, একটু নিশ্চয়তা যা ঢাক বাজিয়ে পাওয়া অসম্ভবপ্রায়।
তবুও, ঢাকিদের আশা মরেনি। তাঁদের বিশ্বাস, যতই আধুনিক হোক উৎসব, যতই পরিবর্তনের ঢেউ আসুক, দুর্গাপূজার দিনগুলো ঢাকের আওয়াজ ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ। ঢাকিরা চান তাঁদের এই শিল্পকে সম্মান দেওয়া হোক, মর্যাদা দেওয়া হোক, আর সর্বোপরি, তাঁদের প্রাপ্য ন্যায্য পারিশ্রমিকটা যেন নিশ্চিত করা হয়।
কারণ ঢাক শুধু এক বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি এক ঐতিহ্য যা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের।

