শুদ্ধশীল ঘোষ : গ্ৰামীণ হাওড়ার বিভিন্ন প্রান্তে,গ্ৰামে গ্ৰামে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে মঙ্গলবার,শনিবার চলে রক্ষাকালীর আরাধনা।আসলে একটা সময় মানুষ মহামারী জাতীয় রোগের হাত থেকে বাঁচতে মারীভয় নিবারণে গ্ৰামে গ্ৰামে রক্ষাকালী পুজোর আয়োজন করতো।বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য মহামারী আয়ত্তে চলে এলেও আজও গ্ৰামে গ্ৰামে সাড়ম্বরে রক্ষাকালীর আরাধনা হয়ে থাকে।হাওড়া জেলা জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় বহু প্রাচীন রক্ষাকালী পুজো।যেগুলোর কথা গ্ৰাম,ব্লক,জেলা ছাড়িয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।তেমনিই একটি পুজো অনুষ্ঠিত হয় হাওড়ার ডোমজুড়ের বারুইপাড়ায়।যে রক্ষাকালী পুজো জেলার অন্যতম প্রাচীন ও বড়ো পুজো গুলির মধ্যে একটি।ফাল্গুনের তৃতীয় মঙ্গলবার।নির্দিষ্ট কোনো তিথির ব্যাপার নেই।ওই দিনই প্রতিবছর দেবী রক্ষাকালীকার আরাধনায় মেতে ওঠেন ডোমজুড়বাসী।
পুজোর সূচনা বহু বছর আগে।দ্বিভুজা রক্ষাকালী,শায়িত শিবের উপর আসীন।দেবীর এক হাতে বরাভয় মুদ্রা,অন্যহাতে কারন পাত্র।এখানকার কালী পুজোর প্রধান আকর্ষণ প্রতিমা মন্দিরে আনার বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।মাতৃমন্দির থেকে বেশকিছুটা দূরে মৃৎশিল্পীর গৃহ,সেখান থেকে পুজোর রাতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে মাথায় করে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মায়ের মৃন্ময়ী বিগ্ৰহ মন্দিরে নিয়ে আসা হয়।কত মানুষ যে অপেক্ষায় থাকে তাঁর রূপ দর্শনের জন্য তা না দেখলে বোঝা যায় না।অগণিত ভক্তকে দর্শন দিতে দিতে মা ভক্তের মাথায় চেপে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন মন্দিরের দিকে।এখানে মায়ের মন্দিরের মাথায় কোনো ছাদ নেই।উন্মুক্ত বেদী।তার উপর অনেক গুলো ধাপ।সবচেয়ে উপরের ধাপে মা বিরাজ করেন।মায়ের অপরূপ রূপ।ঠিক যেন পাঁচ বছরের বালিকা।মায়ের গোটা মুখমণ্ডল জুড়ে এক অদ্ভুত হাসি।কত রকমের গহনা তাঁর অঙ্গ জুড়ে।মাথা ভর্তি চুল,পা পর্যন্ত।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কত মানুষ আসেন শুধু তাঁকে একবার দেখবে বলে।মায়ের মৃন্ময়ী বিগ্ৰহ ফুলে সজ্জিত বেদীর উপরে স্থাপন করার পর তন্ত্রাচারে শুরু হয় মায়ের পুজো।মহানিশায় শুরু হয় পুজো।হয় মানসিক প্রদত্ত ছাগ বলিদান।সারা রাত পুজোর শেষে ভোরবেলায় সূর্যদয়ের আগে মায়ের মৃন্ময়ী বিগ্ৰহের নিরঞ্জন দেওয়া হয়।এই নিরঞ্জনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অলৌকিক রীতি।মায়ের মৃন্ময়ী বিগ্ৰহ জলে নিরঞ্জন দেওয়া হয় না!বরং নদীর ঘাটে রেখে দিয়ে চলে আসা হয়।ভক্তদের বিশ্বাস মা নিজে নিজেই জলে চলে যান।এই কারণেই মায়ের মৃন্ময়ী বিগ্ৰহ মাথা থেকে নামিয়ে নদীর ঘাটে রেখে সবাই চলে আসেন।কেউ পিছনে ফিরে তাকাতে সাহস করেন না।এখানে দেবীর বিগ্ৰহের ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।এর কারণ জানি না!তবে এলাকার কয়েকজন ভক্তের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এ নিয়ম নাকি অনেকদিনের।তাই যারা জানে তারা কেউই মায়ের ছবি মোবাইল বা ক্যামেরাবন্দী করার সাহস পান না।মাকে তারা বন্দী করেন হৃদয়ে।
তাঁকে ঘিরে এক অদ্ভুত আলো!যত অন্ধকার সব মিলিয়ে যাচ্ছে সেই আলোর কাছে।অস্থির মন কেমন যেন শান্ত হয়ে যাচ্ছে তাঁর দর্শনে।কী শক্তি তাঁর।তাঁর সাম্রাজ্যেই আমরা আছি।তিনি যতটুকু দিয়েছেন ততটুকুই আমাদের।’আমার’,
‘আমি’ এই কথা গুলো তাঁর কাছে বড্ড বেমানান।তাঁর স্নেহের পরশে আমাদের মনের যা কিছু মলিনতা দূর হোক।তাঁর ওই বিপুল আলোর ছিটেফোঁটাও যদি আমাদের মধ্যে এসে পড়ে তাহলে ধন্য হব সকলে।

