নিজস্ব সংবাদদাতা,আরএনবি:- বাঙালিদের প্রাণের উৎসব দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এক মিলনমেলা, যা বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও শৈল্পিকতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। শরৎকালে অনুষ্ঠিত এই বার্ষিক উৎসবটি দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়কে উদযাপন করে। এটি বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহত্তম উৎসব এবং ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দেবী দুর্গার সৃষ্টি ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে। একবার দেবতারা মহিষাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবী দুর্গার কাছে সাহায্য চন। দেবী দুর্গা তখন তাঁর ক্রোধ ও শক্তির মাধ্যমে মহিষাসুরকে বধ করে মর্ত্যলোকে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। এই বিজয়ের স্মরণে প্রতি বছর দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও, রামায়ণের ঘটনা অনুসারে, রাবণকে পরাজিত করার জন্য রামচন্দ্র স্বয়ং দেবীর পূজা করেছিলেন, যা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত।
মহালয়ার দিন থেকে দুর্গাপূজার সূচনা হয়, যেখানে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডী পাঠের মাধ্যমে দেবীকে মর্ত্যলোকে আবাহন জানানো হয়। মহাষষ্ঠীতে মূল পুজোর সূচনা হয় এবং দেবীর বোধন করা হয়। এই সময়কালে প্রতিমা তৈরি, প্যান্ডেল নির্মাণ এবং আলোকসজ্জার কাজ চলে। বাঙালি হিন্দুদের কাছে দুর্গাপূজা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি একটি আবেগ ও গভীর বিশ্বাস প্রকাশের মাধ্যম। এই উৎসব সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একত্রিত করে এবং পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করে।
দুর্গাপূজা শুধুমাত্র ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবই নয়, এটি শিল্প, সাহিত্য ও অর্থনীতিরও একটি বড় অংশ। থিম-ভিত্তিক প্যান্ডেল, সুন্দর প্রতিমা নির্মাণ এবং আলোকসজ্জা এই উৎসবকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। প্রতিমা তৈরি, পোশাক ও সাজসজ্জার শিল্পীরা এর মাধ্যমে নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশ করেন। গবেষণায় দেখা গেছে দুর্গাপূজা একটি বিশাল অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে, যেখানে শিল্প ও প্যান্ডেল তৈরির কাজে বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে যেখানে বাঙালি সম্প্রদায় রয়েছে, সেখানেও দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একত্রিত হয়, যা এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
বর্তমানে দুর্গাপূজা আরও আধুনিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বারোয়ারি বা সর্বজনীন দুর্গাপূজার মাধ্যমে সমাজের সকলে মিলেমিশে উৎসবে অংশগ্রহণ করে। থিম-ভিত্তিক প্যান্ডেল ও বিভিন্ন সৃজনশীল উপস্থাপনা দুর্গাপূজাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এই উৎসব কেবল ধর্মীয় ভক্তিই নয়, এটি পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও ধরে রাখে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

