পায়েল পাখিরা,নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতাঃ– পুরীর জগন্নাথ রথযাত্রা হিন্দুধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, জনপ্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এই মহাযাত্রার আয়োজন হয়। এই দিনে ভগবান জগন্নাথ তাঁর ভ্রাতা বলভদ্র ও ভগিনী সুভদ্রাকে নিয়ে বিশাল রথে করে শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই মহোৎসব উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরীতে সমবেত হন এবং পরম ভক্তি সহকারে রথ টেনে পুণ্য অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ভারতের গভীর সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
২০২৫ সালে এই ঐতিহাসিক রথযাত্রা শুরু হবে ২৭ জুন তারিখে। রথযাত্রার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বহু প্রাচীন ও ব্যতিক্রমী রীতিনীতি, যার একটি বিশেষ ঐতিহ্য হল — ভগবান জগন্নাথকে তেতো নিম পাতা বা নিম গুঁড়ো নিবেদন করা। এটি অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কেননা সাধারণত ঈশ্বরকে মিষ্টান্ন নিবেদন করার রীতি প্রচলিত। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ও হৃদয়স্পর্শী কাহিনি, যা ভক্তির এক অনন্য উদাহরণ।
পুরাণে বলা হয়, এক সময় জগন্নাথ মন্দিরের আশেপাশে এক বৃদ্ধা ভক্তা বাস করতেন, যিনি ভগবানকে নিজের সন্তানরূপে দেখতেন। প্রতিদিন তিনি লক্ষ্য করতেন যে ভগবানকে ৫৬ প্রকারের নানাবিধ রুচিকর ও ভারী খাদ্য নিবেদন করা হয়। একদিন তিনি মায়ের মতো উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবলেন — “আমার ছেলেটি এত ভারী খাবার খেলে যদি পেটে ব্যথা হয়!” সেই ভাবনা থেকে তিনি ওষুধ হিসেবে তেতো নিম গুঁড়ো তৈরি করেন এবং তা ভগবানকে নিবেদন করার ইচ্ছা নিয়ে মন্দিরে পৌঁছান।
কিন্তু মন্দিরের দ্বাররক্ষীরা তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় না এবং তার হাতে থাকা নিম গুঁড়ো ছুঁড়ে ফেলে অপমান করে। এতে তিনি গভীর দুঃখে ভেঙে পড়েন, কারণ এক জননীসুলভ স্নেহ নিয়ে তিনি যা এনেছিলেন, তা প্রভুর কাছে পৌঁছল না।
কিন্তু ভগবান কিছুই অদৃশ্য রাখেন না। সেই রাতে তিনি রাজাকে স্বপ্নে এসে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বলেন যে একজন সত্যিকারের ভক্তাকে অপমান করা হয়েছে এবং তাঁর আদেশ অনুসারে রাজাকে ওই বৃদ্ধার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে পুনরায় সেই নিম গুঁড়ো তৈরি করিয়ে নিজে তা ভোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
পরদিন রাজা ভগবানের আদেশ পালন করেন। তিনি নিজে বৃদ্ধার কাছে যান, ক্ষমা চান এবং তাঁর হাতে তৈরি করা সেই নিম গুঁড়ো পূর্ণ শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে ভগবানকে নিবেদন করেন। ভগবানও প্রফুল্লচিত্তে তা গ্রহণ করেন।
সেই দিন থেকে এক চিরন্তন প্রথা শুরু হয় — ৫৬ ভোগের পর ভগবানকে নিম গুঁড়ো নিবেদন করা হয়, যা আজও পুরীতে ভক্তিভরে পালন করা হয়। এই কাহিনি শুধু একটি রীতি ব্যাখ্যা করে না, বরং বোঝায় ভক্তি, মমতা ও ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতা কতটা প্রাণবন্ত ও মানবিক হতে পারে।

