পায়েল পাখিরা, নিজস্ব সংবাদদাতা, আরএনবি: সময়ের কী নির্মম পরিহাস! যিনি একদিন অফিসে টাই পরে গ্রাহকদের আর্থিক পরামর্শ দিতেন, আজ তিনি বসে আছেন বেঙ্গালুরুর এক ব্যস্ত রাস্তার পাশে, একটি প্ল্যাকার্ড হাতে — “১৪ বছরের অভিজ্ঞতা, চাকরি নেই, ঘর নেই, দয়া করে সাহায্য করুন।”
এই হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। বহু মানুষ থমকে দাঁড়িয়েছেন, কিছুটা বিস্ময়ে, কিছুটা সহানুভূতিতে। ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে না এলেও জানা গেছে, তিনি দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে একটি নামকরা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করতেন। তবে কোভিডের পরবর্তী সময়ে সংস্থার পুনর্গঠনের নামে অনেক অভিজ্ঞ কর্মীকেই ছাঁটাই করা হয়, এবং তিনিও তার ব্যতিক্রম হননি।
প্রথমদিকে কিছু সঞ্চয় আর সহায়ক বন্ধুদের ভরসায় চলছিল জীবন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয় ফুরিয়ে যায়, পরিচিতরাও মুখ ফিরিয়ে নেন। আজ, মাথার ওপর ছাদ নেই, খাবারের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে পথচারীদের দয়ার ওপর। বেঙ্গালুরুর মতো মেট্রো শহরে যেখানে প্রতিদিন লাখো মানুষ প্রযুক্তি ও প্রগতির প্রতীক হয়ে অফিসে যাচ্ছেন, সেখানে এই দৃশ্য যেন আমাদের উন্নয়নের অন্য এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।
তার হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা — “আমি আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই। চাকরি চাই, সাহায্য চাই, ভিক্ষা নয়।” এই শব্দগুলি যেন কেঁপে ওঠে মানবতার এক গভীর সুরে। তিনি সাহায্য চাইছেন, কিন্তু সেটা খাদ্য কিংবা অর্থ নয় — তিনি চাইছেন সম্মানজনক কাজের সুযোগ।
এই ঘটনার পর সমাজমাধ্যমে একাধিক ব্যক্তি এবং সংস্থা তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন। কেউ চাকরির সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন, কেউ সাময়িক আশ্রয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় — এই একটি ঘটনা কি ব্যতিক্রম? নাকি এই দেশের হাজার হাজার মধ্যবিত্ত মানুষের গোপন আতঙ্কের বাস্তব প্রতিচ্ছবি?
আজকের কর্পোরেট দুনিয়ায় যেখানে চাকরি স্থায়ীত্বের কোনো গ্যারান্টি নেই, সেখানে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে। অনেকেই হঠাৎ ছাঁটাইয়ের কবলে পড়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, কেউ কেউ চরম সিদ্ধান্তও নেন। কিন্তু এই ব্যক্তির মতো কেউ যদি লজ্জা ভুলে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারেন, সেটাই হয়তো প্রেরণার।
সমাজ হিসেবে আমাদের উচিত এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো — শুধু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে নয়, বরং কর্মসংস্থানের পথ দেখিয়ে। কারণ আজ যার চাকরি নেই, কাল সে হতে পারে আমাদেরই কেউ — একজন বন্ধু, আত্মীয় কিংবা আমরাই।
শেষমেশ, ওই ব্যাংককর্মীর কণ্ঠেই যেন প্রতিধ্বনিত হয় — “আমি হারতে চাই না, শুধু একটা সুযোগ চাই আবার দাঁড়ানোর।”

