সুইতা পাল, নিজস্ব সংবাদদাতা, আরএনবি:- হাওড়ার সাঁকরাইলের এক প্রান্তিক গ্রাম মহিষগোট। এখানেই বড় হয়েছে কোয়েল বর, এক সাধারণ মুরগির মাংস বিক্রেতার মেয়ে। তবে তার স্বপ্ন একেবারে অসাধারণ— সেই স্বপ্নই তাকে এনে দিয়েছে জোড়া সোনা এবং একসাথে তিন-তিনটি বিশ্ব রেকর্ড। মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বজয় করা এই বাংলার কন্যা আজ গোটা দেশের গর্ব।
আজকের প্রজন্ম যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া রিলস বা ভার্চুয়াল পরিচিতিতে মত্ত, সেখানে কোয়েল বেছে নিয়েছে একেবারে ভিন্ন পথ। সে বেছে নিয়েছে কসরত, পরিশ্রম আর অদম্য মানসিকতা— যা তাকে পৌঁছে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে।
২০২৫ সালে আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ যুব ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতায় কোয়েল এমন কীর্তি গড়েছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর। যেখানে আগের বিশ্ব রেকর্ড ছিল ১৮৮ কেজি, সেখানে কোয়েল তুলেছে মোট ১৯২ কেজি। ক্লিন অ্যান্ড জার্ক বিভাগে ১০৭ কেজি (পূর্বতন রেকর্ড ১০৫ কেজি) এবং স্ম্যাচ বিভাগে ৮৫ কেজি তুলে সে তৈরি করেছে নতুন ইতিহাস।
এই জয় শুধুই প্রতিযোগীদের হারিয়ে ট্রফি জেতা নয়— বরং চরম দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ আর একগুঁয়েমি বাস্তবতাকে হার মানিয়ে নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে প্রতিষ্ঠা করা।
কোয়েলের বাবা মিঠুন বর, এক সময় ধুলাগড় ট্রাক টার্মিনালে মজুরের কাজ করতেন। এখন তিনি চালান মুরগির মাংসের দোকান। নিজেও এক সময় খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে নিজের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। সেই স্বপ্নই আজ যেন বাস্তব রূপ নিচ্ছে কোয়েলের মধ্যে দিয়ে।
মাত্র ১১ বছর বয়সেই কোয়েলের ক্রীড়াজগতে হাতেখড়ি। বাবার উদ্যোগে ভর্তি হন স্থানীয় ভারোত্তোলন কোচ অষ্টম দাসের কাছে। ২০১৯ সালে হুগলির কোন্নগরে এক প্রতিযোগিতায় প্রথম পদক জেতেন। তারপর ১৩ বছর বয়সে কমনওয়েলথ ওয়ে টলি ফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ১৫৫ কেজি তুলে সোনা, এবং এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ১৫২ কেজিতে রুপা— একের পর এক নজরকাড়া সাফল্য।
এরপর ভারতীয় দলের প্রধান কোচ বিজয় শর্মার নজরে আসেন কোয়েল। তিনি বুঝতে পারেন— এই মেয়েটির মধ্যে লুকিয়ে আছে অলিম্পিক স্তরের প্রতিভা। তিনি কোয়েলের টেকনিক নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যেই সেই কঠোর পরিশ্রম ফল দেয়।
২০২৫ সালের কমনওয়েলথ গেমসে শুধু ইয়ুথ নয়, জুনিয়র বিভাগেও কোয়েল সোনা জেতে। তিন-তিনটি বিভাগে বিশ্ব রেকর্ড করে সে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করে।
তবে সাফল্য সত্ত্বেও কোয়েলের উচ্চাশা থেমে নেই। তার কথায়—
“বিশ্ব রেকর্ড করা আমার লক্ষ্য ছিল। অনুশীলনে আমি ১০৭-১০৮ কেজি তুলতে পারতাম। ১০৯ কেজিও তুলতে পারতাম, অল্পের জন্য পারিনি।”
এই আত্মসমালোচনার মনোভাব, নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট না থাকা, এবং আরও বড় কিছু করার খিদেই কোয়েল বর-কে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী। তার একমাত্র লক্ষ্য— ভারতের হয়ে অলিম্পিক মঞ্চে সোনা জয়।
আমরা আশাবাদী, এই সংগ্রামী বাঙালি মেয়ের হাত ধরেই একদিন বাংলার ঘরে আসবে অলিম্পিক পদক। কোয়েল শুধু এক ক্রীড়াবিদ নন— তিনি এক অনুপ্রেরণা, লাখো তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।

