সুরোজ ছড়ি,নিজস্ব সংবাদদাতা,কলকাতা:পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ঠিক একদিন পর, সোমবার পাকিস্তান ভারতের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে চুক্তি পুনরায় কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে। ইসলামাবাদ বলছে, চুক্তিটি এখনো বৈধ এবং কার্যকর। আন্তর্জাতিক আদালতের সাম্প্রতিক রায় সেই দাবিকে সমর্থন করেছে বলেও দাবি করছে তারা।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের প্রসঙ্গ তুলে ভারতের বিরুদ্ধে সুর চড়াল পাকিস্তান
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়,
“২৭ জুন হেগের স্থায়ী সালিশি আদালতের দেওয়া রায় পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে, সিন্ধু জল চুক্তি এখনো কার্যকর এবং ভারত একতরফাভাবে সেটি বাতিল করতে পারে না। তাই ভারত যেন অবিলম্বে চুক্তির অধীনে স্বাভাবিক কার্যক্রম আবার শুরু করে।”
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার এক্স (সাবেক টুইটার)-এ নিজের পোস্টে লেখেন,
“কিষাণগঙ্গা ও রাতলে প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তানের আপত্তির বিষয়টি আদালত গ্রহণ করেছে এবং রায় আমাদের পক্ষেই গিয়েছে। এটি নিশ্চিত করে যে ভারত একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। চুক্তির প্রতি আন্তর্জাতিক আনুগত্য বজায় রাখা প্রতিটি দেশের দায়িত্ব।”
কিষাণগঙ্গা ও রাতলে প্রকল্প নিয়েই মূল আপত্তি
২০১৬ সালে পাকিস্তান ভারতের দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প — জম্মু ও কাশ্মীরের কিষাণগঙ্গা (৩৩০ মেগাওয়াট) এবং রাতলে (৮৫০ মেগাওয়াট) — এর নকশা নিয়ে আপত্তি তোলে। তাদের দাবি ছিল, এই প্রকল্পগুলি সিন্ধু চুক্তির নিয়ম ভেঙে তৈরি হচ্ছে এবং এর ফলে পাকিস্তানের পানির অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরবর্তীতে তারা সালিশি আদালতে যায়। তবে ভারত প্রথম থেকেই এই আদালতের কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। ভারত সরকার তখন জানায়, আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের এখতিয়ার তারা মানে না, কারণ পাকিস্তান “দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা” লঙ্ঘন করে তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করেছে।
আদালতের রায়: ‘চুক্তি বৈধ, রায় বাধ্যতামূলক’
সালিশি আদালত ভারতীয় অংশগ্রহণ ছাড়াই রায় দেয়। তাতে বলা হয়:
- সিন্ধু জলচুক্তি এখনো বৈধ এবং প্রযোজ্য।
- পাকিস্তানের করা মামলা গ্রহণযোগ্য।
- আদালতের রায় সব পক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক।
- এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই।
এ রায়ের পর পাকিস্তান উৎসাহিত হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে শুরু করেছে।
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া: আদালতের বৈধতা অস্বীকার
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে,
“এই আদালতের কোনও বৈধতা ভারত স্বীকার করে না। পাকিস্তান একতরফাভাবে তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করে সিন্ধু জলচুক্তির শর্ত ভেঙেছে। আমরা সালিশি আদালতের পূর্ববর্তী ও বর্তমান সব রায় প্রত্যাখ্যান করছি।”
ভারতের ভাষ্যে, সিন্ধু জলচুক্তি ছিলদ্বিপাক্ষিক সমঝোতা, এবং কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে তার মীমাংসা হতে পারে না।
পরিণতি কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের এই সংঘাত ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার জল-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পাকিস্তান যেহেতু আন্তর্জাতিক সমর্থন নেওয়ার চেষ্টা করছে, ভারতকেও কূটনৈতিকভাবে চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, পরিস্থিতির আরও অবনতি না ঘটিয়ে দুই দেশের উচিত আলোচনা করে সমাধানের পথ খোঁজা।
সিন্ধু জল চুক্তি ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত হয়। সেই থেকে এটি দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী ঘটনা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে বিরোধ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের রায় – সব মিলিয়ে এই চুক্তি নিয়ে এখন চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

