সুরোজ ছড়ি,নিজস্ব সংবাদদাতা:জঙ্গলমহলে হাতির উৎপাত দিন দিন বাড়ছে। রোজই কোথাও না কোথাও হাতির দল ঘরবাড়ি ভেঙে দিচ্ছে, ফসলের ক্ষতি করছে, মানুষ আহত হচ্ছে এবং প্রাণহানিও ঘটছে। এতে জঙ্গলের কাছের গ্রামের মানুষেরা খুব ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এই মারাত্মক মানুষ-হাতির লড়াই কমাতে রাজ্য বন দফতর জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। সম্প্রতি ঝাড়গ্রামে চারটি বনবিভাগের প্রধান কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে।
এই বৈঠকে রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপাল ও বন্যপ্রাণ ওয়ার্ডেন সন্দীপ সুন্দ্রীওয়াল, দক্ষিণবঙ্গের অতিরিক্ত মুখ্য বনপাল নীলাঞ্জন মল্লিক সহ ঝাড়গ্রাম, খড়গপুর, রূপনারায়ণ ও মেদিনীপুর বনবিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বন দফতর জানিয়েছে, হাতি-মানুষের এই সমস্যা কমাতে তারা তাৎক্ষণিক এবং স্থায়ী দু’রকম পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করছে।
শুরুতে, হাতি যাতে লোকালয়ে ঢুকতে না পারে তার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও মানুষকে সচেতন করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ঝাড়গ্রাম, মানিকপাড়া ও গিধনি রেঞ্জের জঙ্গলের পাশের ১০টি গ্রাম, যেমন – কুসুমঘাঁটি, কুসুমডাঙা, ঘটিডুবা, জারালাটা, জোয়ালভাঙা, ইত্যাদিকে সৌরবিদ্যুৎ চালিত মজবুত বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হবে। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বেড়ার জন্য আদিবাসী উন্নয়ন দফতরে ৭০ লক্ষ টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বন দফতর জানিয়েছে, এবার শুধু বেড়া বসালেই হবে না, তার ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণেওবিশেষ নজর দেওয়া হবে। জামবনি ব্লকের গিধনি এলাকার ৪০ কিলোমিটার জঙ্গলজুড়ে আরও শক্তিশালী বেড়া তৈরি করা হবে, যার জন্য ৬০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে।
আগে বেলপাহাড়ি সীমান্তে হাতির হামলা ঠেকাতে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার খাল কাটা হয়েছিল, কিন্তু বৃষ্টির জলে তা ভরে যাওয়ায় অকেজো হয়ে পড়ে। তাই এবার সেই পদ্ধতি বাতিল করে পুরো মনোযোগ আধুনিক বেড়ার দিকেই দেওয়া হচ্ছে। হাতি যখন আসে, তখন তার কাছাকাছি গিয়ে ভিডিও তোলা বা রিল বানানোর মতো বিপজ্জনক কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে প্রচার চালানো হবে। এতেও কাজ না হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বন দফতর।
হাতি-মানুষের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বন দফতর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল, হাতিদের প্রাকৃতিক বাসস্থানেই পর্যাপ্ত খাবার ও জলের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা লোকালয়ে না আসে। হাতির পছন্দের খাবার যেমন – বেল, আম, কাঁঠাল, ডুমুর, বাঁশ সহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক লক্ষ চারা গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বন দফতরের চারটি নার্সারিতে এই গাছগুলো তৈরি করা হচ্ছে।
হাতির থাকার উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য জামবনি ব্লকের গিধনি অঞ্চলে প্রায় সাড়ে চার হাজার হেক্টর এলাকায় হাতির বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে ১৬টি পুকুর খোঁড়া হবে, যার মধ্যে ৫টি ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। বাকি ১১টির কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। একটি বড় জলাশয়ও তৈরি করা হবে। এই প্রকল্পের জন্য ঝাড়গ্রাম বনবিভাগ প্রায় দেড় কোটি টাকা পেয়েছে।

